ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরবর্তী সাত বছরের বাজেট পরিকল্পনা নিয়ে জোটের দুই প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যকার বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। ২০২৮ থেকে ২০৩৪ সাল মেয়াদের জন্য ইউরোপীয় কমিশন প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইউরোর যে বাজেট প্রস্তাব করেছে, তাতে বড় ধরনের ব্যয়সংকোচন করা হবে কি না, তা নিয়ে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। এতে ডিসেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

২০২১ থেকে ২০২৭ মেয়াদে ইইউর বাজেট ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউরো। নতুন প্রস্তাবে আকার প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়ানোয় আপত্তি জানিয়েছে জার্মানির নেতৃত্বাধীন একটি পক্ষ। তাদের সঙ্গে রয়েছে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন। ব্যয়সংকোচনপন্থী এই দেশগুলোর দাবি, সদস্যদেশগুলো যখন অর্থনৈতিক সংযমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ইইউর বাজেট থেকে কয়েক শ বিলিয়ন ইউরো ছাঁটাই করা উচিত। অন্যদিকে জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) রাজনৈতিক উত্থান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে বাড়তি চাপে রেখেছে।

বিপরীতে ইউরোপের দ্বিতীয় শীর্ষ অর্থনীতি ফ্রান্স মনে করে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট ও ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় বাজেট প্রয়োজন। দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মতে, ইউরোপের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে কৃষকদের সহায়তাসহ বড় তহবিল জরুরি। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখো ব্যয়ছাঁটের বিরোধিতা করে গত মাসে বলেন, “আমাদের একটি উচ্চাভিলাষী ইউরোপীয় বাজেট প্রয়োজন। ইইউর অগ্রাধিকারগুলো, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে সহায়তা দিতে আমাদেরকে আরও শক্তিশালী ইউরোপীয় বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।” তবে ফ্রান্সেও নিজস্ব বাজেটসংকটের মুখে উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন জাতীয় ঋণের বোঝা কমাতে ইইউতে বরাদ্দ হ্রাসের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

বাজেট নিয়ে মতভেদ শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ১৭টি সদস্যদেশ ‘ফ্রেন্ডস অব কোহেশন’ বা ‘সংহতির পক্ষে বন্ধুরা’ নামে জোট গঠন করে কৃষি ও আঞ্চলিক উন্নয়নে বাড়তি বরাদ্দের দাবি তুলছে। সদস্যদেশগুলোর ওপর চাপ না বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়াতে বড় কোম্পানি, ইলেকট্রনিক বর্জ্য ও তামাকজাত পণ্যের ওপর নতুন কর আরোপের প্রস্তাব করেছে ইউরোপীয় কমিশন। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বড় ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন জুয়াব্যবস্থার ওপর করের সুপারিশ করলেও অনেক দেশ তা সমর্থন করছে না।

বড়দিনের আগেই এ বিষয়ে মীমাংসা চাইছে ইইউ, যাতে বিষয়টি আগামী বছরের বিভিন্ন দেশের জাতীয় নির্বাচনের ওপর প্রভাব ফেলতে না পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী শক্তির উত্থান জোটের ঐক্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। আগামী মাসে স্পেনের আগাম নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে। শনিবার জোটের পর্যায়ক্রমিক সভাপতি আয়ারল্যান্ড একটি সংশোধিত প্রস্তাব উপস্থাপন করবে, যার ওপর ভিত্তি করে আগামী সপ্তাহে ব্রাসেলসে দুই দিনের বৈঠকে বসবেন নেতারা। আইনিভাবে ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত সময় থাকলেও ইউরোপের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানান, “এই কাজটি সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সবার মধ্যেই তাগিদ রয়েছে।”